অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভূমিকা

সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে কোনো দেশের সর্বস্তারের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধিকে বোঝায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে ক্রমবর্ধমান হারে মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয় এবং সর্বোপরি মানুষের জীবন যাপনের মান উন্নয়ন হয়ে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো কেটি প্রক্রিয়া বা চলনশীল গতি যার দ্বারা দীর্ঘকালীন মেয়াদে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রকৃত জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হয় এবং সমাজে নতুনতর গতিবেগ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতোমধ্যেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাপক অবদান রাখতে শুরু করেছে। ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রসার এখন বিশ্বটাকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। মোবাইল ফোনের সম্প্রসারণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। আজ দেশের অধিকাংশ লোকের হাতে মোবাইল ফোন শোভা পায়। গ্রামের দরিদ্র কৃষক, দিনমজুরের কাছেও পৌছে গেছে মোবাইল ফোন। এছাড়া মোবাইল ফোনে ইন্টারনেন্ট সেবা যুক্ত হওয়ায় এটি এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও আরও একটি মাইলফলক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে অতি দ্রুত অন্যের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। আগে যেখানে কারো সাথে যোগাযোগ করতে প্রচুর সময়, অর্থ এবং পরিশ্রম ব্যয় হতো এখন সেটি মোবাইল ফোনের কল্যাণে অনায়াসেই করা সম্ভব হচ্ছে। দেশে মোবাইল ফোননির্ভর ব্যাংকিং সেবা চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী যাদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ নেই তাদের জন্য সেই সেবার দ্বার উম্মুক্ত হয়েছে। নিরাপদ ও সহজ আর্থিক মোবাইল ব্যাংকিং একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোকই গ্রামে বাস করেন। তাই এই বিরাট জনগোষ্ঠী উন্নয়ন করা গেলেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এখন গ্রামের একজন কৃষক তার জমিতে ফসলের চারা লাগানোর আগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই নানা অভিজ্ঞজনের কাছ থেকে চাষের করণীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে অগ্রীম তথ্য পাচ্ছেন, উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারছেন, জমিতে উৎপাদিত শস্য বিক্রয় ও বিপণনের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অতি দ্রুত যোগাযোগ করতে পারছেন। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আসছে অভূতপূর্ব সাফল্য। কৃষকের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় জড়িত লোকজন এখন আগের চাইতে আরও সহজে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছেন।

কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এখন দেশের শিক্ষিত সমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিংয়ের জোয়ারের ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। বর্তমানকালে বিশ্বের নানা প্রান্তের বায়ারগণ তাদের পছন্দসই কাজগুলো স্বল্প বাজেটে বাইরের দেশের কর্মীদের কাছ থেকে করিয়ে থাকেন। এটি আউটসোর্সিং নামে পরিচিত। বিভিন্ন গ্লোবাল আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লেস যেমন- ফ্রিল্যান্সার ডট কম, ওডেস্ক, গুরু ইত্যাদি লাখ লাখ কাজের সুযোগ রয়েছে। কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ এখন এসব মার্কেটপ্লেসে নিজের পছন্দসই কাজগুলো খুঁজে নিচ্ছে। বাড়িতে বসেই কাজ করছেন এবং বায়ারকে সেই কাজ সমসয়মতো জমা দিয়ে অনলাইনে আয় করছেন হাজার হাজার ডলার। এই কাজে যুক্ত আছেন নারী-পুরুষ সকলেই। অভিজ্ঞ গৃহিণীরা বা মেয়েরা ঘরের ভেতরে বসেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশে ফ্রিল্যান্সিং এখন একটি বহুল জনপ্রিয় অনলাইন পেশায় রূপ নিতে শুরু করেছে। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এর প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। 

ফ্রিল্যান্সিং পেশায় এসে আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে উপার্জন করার মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী এখন বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে শুরু করেছে। এদের মাধ্যমে দেশে আসছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। দেশের অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। এক গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারাটাকে যেভাবে বদলে দিয়েছে ধারণা করা হচ্ছে আগামী দিনে আউটসোর্সিং খাতটিই হয়ে উঠবে গার্মেন্টস এর মতো বিশাল এক খাত। এমনকি এর মাধ্যমে উপার্জনের পরিমাণটি অবদানকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

কৃষি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত দেশের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তার স্পর্শ রাখেনি। এর ছোঁয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিন দিন বেড়েই চলেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক অবকাঠামোগত পারলে এর মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব হবে। এতে দেশের অর্থনীতির চাকা আর বেশি সচল হবে। ফলস্বরূপ জাতীয় অর্থনৈদিক সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে। কাজেই কোনোভাবেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই।

 

Advertisements

advertise

Copyright © Tutorials Valley