রোবোটিক্স হলো প্রযুক্তির একটি শাখা যেটি রোবটসমূহের ডিজাইন, নির্মাণ, কার্যক্রম ও প্রয়োগ নিয়ে কাজ করে। পাশাপাশি এটি রোবটসমূহের নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরি ফিডব্যাক এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য কম্পিউটার সিস্টেমগুলোর জন্যও কাজ করে। এসব প্রযুক্তি অটোমেটেড মেশিনগুলোর সাথে কাজ করে যা বিপজ্জনক পরিবেশ বা উৎপাদন প্রক্রিয়াসমূহে মানুষের স্থান দখল করে কিংবা মানুষের উপস্থিতি, আচরণ ইত্যাদির সাথে মিল থাকে। আজকের দিনের অধিকাংশ রোবটই ‘বায়ো-ইন্সপায়ার্ড রোবেটিক্স’ ক্ষেত্রটির দ্বারা উৎসাহিত হয়ে তৈরি। সহজভাবে বলতে গেলে রোবোটিক্স এর সাধারণ বিষয়গুলো হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মনোবিদ্যা। এই প্রযুক্তিটি কম্পিউটার বুদ্ধিমত্তা সংবলিত এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত রোবট মেশিন তৈরি করে যেগুলো আকৃতিগত দিক থেকে অনেকটাই মানুষের মতো হয় এবং অনেকটা মানুষের মতোই দৈহিক ক্ষমতাসম্পন্ন থাকে। এই ক্ষেত্রটিতে তাই রোবটকে যেসব বৈশিষ্ট্য দেয়ার চেষ্টা করা হয় সেগুলৈা হলো ঃ

 

১.       দৃষ্টিশক্তি বা ভিজ্যুয়াল পারসেপশন (ঠরংঁধষ চবৎপবঢ়ঃরড়হ)

২.       স্পর্শ বা স্পর্শ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সক্ষমতা (ঞধপঃরষব ঈধঢ়ধনরষরঃরবং)

৩.      নিয়ন্ত্রণ ও ম্যানিপুলেশনের ক্ষেত্রে দক্ষতা বা নিপুণতা (উবীঃবৎরঃু)

৪.       যেকোনো স্থানে দৈহিকভাবে নড়াচড়ার ক্ষমতা বা লোকোমোশন (খড়পড়সড়ঃরড়হ)

৫.       কোনো একটি গন্তব্যে কারও যাবার পথকে যথাযথভাবে খুঁজে বের করার বুদ্ধিমত্তা বা নেভিগেশন (ঘধারমধঃরড়হ)

 

রোবোটিক্স শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ শব্দ হতে যা প্রবর্তিত হয় চেক লেখক ও নাট্যকার কারেল কাপেক (কধৎবষ ঈধঢ়বশ) এর একটি নাটক হতে যেটি ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয়। জড়নড়ঃ শব্দটি মূলত এসেছে স্লাভিক শব্দ জড়নড়ঃধ হতে যার অর্থ হলো ‘শ্রমিক’। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী ‘রোবোটিক্স’ শব্দটি সর্বপ্রথম প্রিন্টে ব্যবহার করা হয় ‘আইজাক অসিমভ’ এর ছোট সায়েন্স ফিকশন গল্প ‘লায়ার’ এ যা ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। আজকের দিনে রোবোটিক্স হলো দ্রুত বর্ধনশীল একটি ক্ষেত্র। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে সাথে গবেষণা, নকশা এবং নতুন নতুন রোবট তৈরির ফলে বিভিন্ন ধরণের ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে- তা সে ঘরোয়া, বাণিজ্যিক বা সামরিক কাজই হোক না কেন সব কাজেই রোবটকে ব্যবহার করা যায়।

 

রোবোটিক্স এর মূল বিষয়টিই হলো রোবটকে ঘিরে। রোবট হলো কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বা যন্ত্রমানব যা মানুষের অনেক দুঃসাধ্য ও কঠিন কাজ করতে পারে। এর কাজের ধরন দেখে মনে হবে এর ভেতর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রয়েছে। রোবট মানেই যে মানুষের মতো যন্ত্র হতে হবে তা নয়। রোবট এমন একটি যন্ত্র যা কখনো সম্পূর্ণরূপে বা অংশত মানুষকে নকল করবে; কখনো চেহারায়, কখনো কাজের মধ্য দিয়ে, কখনো আবার দু’ভাবেই। অবশ্য এতে এমনভাবে প্রোগ্রাম বেঁধে দেওয়া আছে যা প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে বেঁধে দেওয়া যায়। কিছু কিছু রোবট শুধু প্রোগাম অনুসারেই কাজ করে আবার অনেকগুলোকে দূর থেকে লেজার রশ্মি বা রেডিও সিগন্যালের সাহায়্যে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যানবাহন ও গাড়ির কারখানায়, বিপজ্জনক যেমন- বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ কাজে, শিল্পক্ষেত্রে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার কাজে, ঘরের প্রাত্যহিক অনেক কাজকর্ম এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে জটিল সব অপারেশনে সার্জনদের নানা ধরনের কাজে রোবট সহায়তা করে।

 

রোবটিক্স এর ব্যবহার

রোবোটিক্স এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহারগুলো উল্লেখ করা হলো ঃ

১.       কম্পিউটার-এইডেড ম্যানুফেকচারিং (ক্যাম) এ রোবোটিক্সকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে যানবাহন ও গাড়ির কারখানায় রোবট ব্যবহৃত।

 

২.       যে সমস্ত কাজ করা স্বাভাবিকভাবে মানুষের জন্য বিপজ্জনক যেমন- বিষ্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ, ডুবে যাওয়া জাহাজের অনুসন্ধান, খনি অভ্যন্তরের কাজ ইত্যাদির ক্ষেত্রে রোবটিক ডিভাইস বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়।

 

৩.      শিল্পক্ষেত্রে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের বা বিপজ্জনক ও জটিল কাজগুলো রোবটের সাহায্য করা যায়। কারখানায় কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত রোবটের সাহায্যে নানা রকম বিপজ্জনক ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ যেমন- ওয়েল্ডিং, ঢালাই, ভারী মাল ওঠানো বা নামানো, যন্ত্রাংশ সংযোজন ইত্যাদি করা হয়।

 

৪.       রোবর্ট অতিক্ষুদ্র মাইক্রোসার্কিটের উপাদান পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অবিশ্বাস্যভাবে পরীক্ষা করতে পারে যা করা মানুষের পক্ষে কঠিন এবং অসম্ভব। শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত অনেক রোবটের অবয়ন মানুষের মতো নয়। সেখানে ব্যবহৃত রোবটগুলোর এক বা একাধিক কর্মক্ষম বাহু থাকতে পারে যা নির্দেশ অনুসারে কাজ করে যায়।

 

৫.       বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে বিল্ডিংসমূহ জুড়ে বিভিন্ন মেইল স্টেশনে মেইল ডেলিভারির কাজে বিশেষ ধরনের রোবট ব্যবহার করা হয়। আলট্রা ভায়োলেট পেইন্ট দিয়ে মার্ক করা রুটগুলোকে এসব রোবট অনুসরণ করে।

৬.       পারমাণবিক কেন্দ্রে ক্ষতিকর তেজষ্ক্রিয়ায় যে সব কর্মী কাজ করেন তাদের ঝুঁকি অনেক। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রোবট মানুষের বদলে কাজ করতে পারে।

 

৭.       উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তার জন্য রোবট ব্যবহৃত হয়। মাইক্রোওয়েভ ভিশনের মাধ্যমে যেকোনো অধাতব দেয়ালের অপর পাশে কি আছে তা দেখতে পারে, অন্ধকারে কয়েকশ ফুট দূর থেকে আগন্তুক দেখতে পায় নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা রোবট। তাই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ অনেক ভবন পাহারায় ব্যবহার করা হয়।

 

৮.      বিশ্বের বহু দেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবেলায় রোবটকে ব্যবহার করে। যেমন- জিম্মি মুক্ত করা, গোলাগুলি ইত্যাদির মতো পরিস্থিতিতে গুলি করতে, দরজা খুলতে, সামনে গিয়ে অবলোকন করতে বা ক্যামেরার সাহায্যে জানালায় নজর রাখতে ঘটনাস্থলে রোবটকে ব্যবহার করা হয়।

 

৯.       সামরিক ক্ষেত্রেও রোবটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বোমা নিস্ক্রিয় করা, ভূমি মাইন সনাক্ত করা, সামরিক নানা সরঞ্জামাদি বহন এবং অন্যান্য মিলিটারি অপারেশনে রোবট ব্যবহার করা হয়।

 

১০.     কিছু কিছু রোবট হাঁটতে পারে এবং মানুষের সাথে কথা বলতে পারে। রুটিন মাফিক ঘরের প্রাত্যহিক অনেক কাজকর্ম; যেমন- কফি তৈরি করা, ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজে রোবটকে ভূত্যের মতো ব্যবহার করা যায়।

 

১১.     চিকিৎসারক্ষেত্রে জটিল সব অপারেশনের সার্জনদের নানা ধরনের কাজে রোবট সহায়তা করে।

 

১২.     মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে রোবটের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মানুষের পরিবর্তে মহাকাশ অভিযানে এখন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্বলিত রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি মঙ্গলগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের নাসা কর্তৃক ‘কিউরিসিটি’ নামের একটি রোবট পাঠানো হয়েছে যেটি মঙ্গলের পরিবেশ, প্রকৃতি ইত্যাদি হতে তথ্য নিয়ে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে।

যেকোনো সমস্যায় নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করার জন্য মানুষের মতো রোবটে কৃত্রিম বুদ্ধি দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে রোবট অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের কর্মপদ্ধতিও বদলাতে পারে।

 

Advertisements

advertise

Copyright © Tutorials Valley